Thursday, December 18, 2008

গুগলের আর একটি অভাবনীয় উদ্ভাবন বাথরুম ইন্টারনেট কানেকশন

প্রকাশ: দৈনিক ইত্তেফাক, আইটি কর্নার, ৭ এপ্রিল ২০০৭

একবার ভাবুন তো, আপনার বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ স্থলটি হল আপনার বাথরুম। খুব অবাক করার মতো হলেও এই অভাবনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করবে বিশ্বের সেরা সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠান গুগল। তাদের এই নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির নাম হচ্ছে টিআইএসপি বা টয়লেট ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। গত ১ এপ্রিল গুগল এই সেবা প্রদান শুরু করেছে। বিনামূল্যের এই সেবার আওতায়

ব্যবহারকারীরা পুরো ঘরকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত করতে পারবেন। আর এই সংযোগ স্থাপন হবে ব্যবহারকারীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার সাথে। সংযোগ পেতে কেবলমাত্র গুগলে রেজিস্ট্রেশন করলেই হবে। বাদবাকি কাজ করতে গুগল একটি সেল্ফ ইন্সটলেশন প্যাকেজ পাঠিয়ে দিবে। ইন্টারনেট সংযুক্তির জন্য এখানে কেবল একটি ওয়াইফাই সক্ষম কম্পিউটার ও স্থানীয় মিউনিসিপল পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার সাথে

সংযুক্ত একটি বাথরুম থাকলেই চলবে। গুগলের কো-ফাউন্ডার এবং প্রেসিডেন্ট ল্যারি পেজ বলেন ‘গুগল এই প্রজেক্টের পেছনে অনেকদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছিল। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য সবগুলো উপায় বের করা যার মাধ্যমে মানুষকে ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত করা সম্ভব। মানুষের ঘরে ঘরে ইন্টারনেট পৌছে দেবার ক্ষেত্রে যে সকল প্রতিকূলতা ছিল তার প্রায় সবগুলোই আমরা উত্তরণের সক্ষম হয়েছি। যারা এই সংযোগের জন্য রেজিস্ট্রেশন করবেন তারা সবাই বাড়িতে একটি সেল্ফ ইন্সটলেশন কিট পাবেন। যেখানে একটি ওয়্যারলেস রাউটার, ফাইবার অপটিক ক্যাবল এবং ইন্সটলেশন সিডি থাকবে। কমোড থেকে ফাইবার অপটিক ক্যাবল সবচেয়ে কাছের টিআইএসপি একসেস মোডে প্লাগইন করতে হবে। এর জন্য কমোড থেকে ক্যাবল প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পিএইচডি (প্ল্যাম্বিং হার্ডওয়্যার ডিসপ্যাচার্স) ১ ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করবে। ইন্টারনেট সংযোজনের এই অভিনব পদ্ধতি এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র আমেরিকাতে পাওয়া যাচ্ছে। গুগলের ইচ্ছে ভবিষ্যতে এই সুবিধা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়ার।

এম এইচ মিশু

Wednesday, December 17, 2008

‘বাংলাদেশ যুদ্ধের বন্দীরা’: যে যুদ্ধের শেষ নেই

প্রকাশ: দৈনিক প্রথম আলো, বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যা, ১৬-‌১২‌-২০০৮


‘বাংলাদেশ যুদ্ধের বন্দীরা’: যে যুদ্ধের শেষ নেই
ফারুক ওয়াসিফ
যুদ্ধের মধ্যে একজন সৈনিকের সামনে চারটি সম্ভাবনা থাকে: অক্ষত অবস্থায় জয়, আহত হওয়া, রণাঙ্গনে মৃত্যুবরণ এবং যুদ্ধবন্দী হওয়া। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন অনিল আথালে’র ভাগ্যে শেষেরটিই বরাদ্দ ছিল। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের পাঞ্জাব সীমান্তে নিয়তি পাকিস্তানি সৈনিকের চেহারায় এসে তাঁকেসহ তাঁর ছয় সহযোদ্ধাকে বন্দী করে। পরের কাহিনীতে তাই যুদ্ধের উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ নেই। রয়েছে জেল থেকে জেলে আটক থাকার দুঃসহ স্মৃতি।
ভারতের এ রকম আরও দুই হাজার ৩০৭ জন যুদ্ধবন্দী সৈনিকের মধ্যে স্থান হয় তাঁর। এঁদের কেউ কেউ আটক হন বাংলাদেশের রণাঙ্গনে, তবে বেশির ভাগই বন্দী হন ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে।
এর ঠিক ১১ দিন পর পূর্ব রণাঙ্গনে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা ও বেসামরিক নাগরিককে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অস্ত্র সমর্পণ করে যুদ্ধবন্দীর ভাগ্য বরণ করে নিতে হয়। শুরু হয় দুই হাজার ৩০৭ বনাম ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের কূটনৈতিক খেলা। আর তাতে জড়িত হয়ে যায় বাংলাদেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নও। কেননা, ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আলাদা একটি যুদ্ধ হলেও বাংলাদেশকে ঘিরে তা হওয়ায় এই যুদ্ধবন্দীদের পরিচয় দাঁড়ায় ‘বাংলাদেশ যুদ্ধের বন্দী’।

বন্দীস্মৃতি
ছয় গুর্খা সৈন্যের সঙ্গে অনিল সীমান্তে টহল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ পাকিস্তানি সৈন্যরা সেই এলাকায় আক্রমণ চালায়। বোমা ও গুলির মধ্যে তাঁরা এক পাথুরে এলাকায় আটকে পড়েন এবং বন্দী হন। দুর্ভাগ্যের সেই শুরু। অনিলের কথায়, ‘চূড়ান্ত বিপদ আর চাপের স্মৃতি মানুষ কখনো ভোলে না। এখনো মনে হয় ওসব যেন গতকালের কাহিনী।’
তাঁদের চালান করা হয় রাওয়ালপিন্ডির সেনাসদর দপ্তরে। সেই দলে তিনিই ছিলেন একমাত্র কর্মকর্তা। বাকিরা ‘জওয়ান’। জেরার সময় পাকিস্তানিরা দ্রুতই বুঝে ফেলে এঁর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে না। ক্যাপ্টেন অনিলের মতো পদাতিক বাহিনীর লোকদের কাছে আসলে কোনো কৌশলগত নিরাপত্তা তথ্য থাকে না। ‘কেঁচো যেমন তার সামনের মাটিই দেখে, একজন পদাতিকের নজর তেমনি কেবল তার অবস্থানের চারপাশের কয়েক মাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ রকম তথ্য শত্রুর কোনো কাজেই লাগে না’।
১৫ দিনের মধ্যেই তাঁকে পাঠানো হয় রাওয়ালপিন্ডি জেলের ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে। বন্দীদের আত্মহত্যা ঠেকাতে সেসব কক্ষের ছাদ রাখা হতো উঁচুতে, ঘরে থাকত না কোনো আসবাব। সেখানে বসে শুনতে পেতেন অন্য কোনো সেল থেকে স্লোগান আসছে, ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’। কারা ওরা? ভারতীয়, বাঙালি? কারা? পরে জানা যায়, ওরা বেলুচ। বাংলাদেশে পাকিস্তানি দখলদারির সময় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের জনগণও স্বাধিকারের দাবিতে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। বাংলাদেশে যখন গণহত্যা চলছে, তখন খোদ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচ নেতা-কর্মীদের ধরে ধরে জেলে পোরা হচ্ছে।
প্রথম দিকে রাত হলে বিমানের আওয়াজ আসত। পাকিস্তানের আকাশে ভারতীয় বিমান? আশায় রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতেন অনিল। তাঁর সেলের ছাদেই বিমানবিধ্বংসী বন্দুক বসানো। অনিলের আশা সেখানে বোমা পড়লেই তিনি পালাবেন। তাই বিমানের আওয়াজ পাওয়ামাত্রই বুট পরে বসে থাকতেন।
একদিন আর বিমানের আওয়াজ এল না। কয়েক দিন সব চুপচাপ। তারপর আগমন ঘটল এক মেজরের। রাতের পর রাত না ঘুমানোর ছাপ তাঁর চোখে-মুখে। তিনি অনিলকে জিজ্ঞেস করেন, ‘রাওয়ালপিন্ডি শহর দেখেছ?’ দেখার তো উপায় ছিল না। জেলে আনার পথে অনিলদের তো চোখ ছিল বাঁধা। উত্তর না আসায় খেপে গিয়ে মেজর বলেন, ‘চিন্তা কোরো না, একদিন এখানে বিজয়ীর বেশে তোমরা আসবে। তখন মন ভরে দেখো।’
বিদ্যুৎ চমকে গেলে অনিলের মনে। যুদ্ধ শেষ? পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে! মুক্তি কি আসন্ন?
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষাশেষি কোনো এক দিন। জেলের বাইরে দিয়ে বিরাট এক মিছিলের আওয়াজ আসে। তারা স্লোগান দিচ্ছে, ‘ভুট্টো জিন্দাবাদ’। ঘণ্টাখানেক পর সেই মিছিল ফিরে আসে নতুন স্লোগান নিয়ে, ‘হামারা নয়া সর্দার ভুট্টো জিন্দাবাদ’। সেই রাতেই জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে সরিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু অনিল জানতেন না, আরও কয়েক বছর পর তাঁর আশপাশের কোনো সেলেই ভুট্টো পার্শ্ববর্তী প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে বন্দী হয়ে আসবেন। এবং তারও কিছুদিন পর সেখানেই তাঁকে ফাঁসি দেবেন আরেক জেনারেল জিয়াউল হক।
বাহাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাস। অনিলদের সরিয়ে নেওয়া হয় লায়ালপুরে (তৎকালীন ফয়সালাবাদ জেল) যুদ্ধবন্দীদের জন্য নির্ধারিত শিবিরে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষ হলেও উভয় দেশের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির মুহূর্ত আর আসে না। বাংলাদেশ কোনোভাবেই যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্ণিত করে বিচার শুরু না করে বিষয়টির ফয়সালা করতে রাজি নয়। এভাবে শুরু হয় উভয় দেশের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির কূটনৈতিক যুদ্ধ।

লায়ালপুরের জীবন
লায়ালপুর যুদ্ধবন্দী শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ লতিফ মালিক। একদিন তিনি কয়েকজন বন্দী ভারতীয় কর্মকর্তাকে শিবিরটি ঘুরে দেখান। সেটা এক মারাত্মক জেলখানা। পরপর ১০ ফুট উঁচু তিনটি দেয়ালের চক্কর দিয়ে ঘেরা। জায়গায় জায়গায় ওয়াচপোস্টে মেশিনগানধারী প্রহরী, সার্চলাইট ও শিকারি কুকুর। ওই চিত্র যে দেখেছে, পালানোর সাধ তার উবে যাবে। কর্নেল লতিফ তাই ঠাট্টার সুরে বলতে পারেন, ‘তোমাদের পালানোর অধিকার রয়েছে, যেমন আমাদেরও অধিকার রয়েছে ধরা পড়লে গুলি করে মারার।’ সেখানেই বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের ঘৃণার মাত্রাটা বুঝতে পারা যায়। এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা তো বলেই ফেলে, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা যে বাংলাদেশের বদলে ভারতের হাতে বন্দী এতে আমরা খুশি।’ বাংলাদেশ নাকি তাদের জন্য বোঝা ছিল। বোঝা নেমে যাওয়ায় এখন তারা নাকি খুশি।

সিমলা চুক্তি
দেখতে দেখতে চলে আসে বাহাত্তর সালের জুলাই মাস। খবর আসে ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে সিমলা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তার মানে মুক্তি?
কিন্তু আশার ফুলে তখনো কাঁটা ছিল। বাংলাদেশ যুুদ্ধবন্দীদের মধ্যে চিহ্ণিত ২০০ যুদ্ধবন্দীর মুক্তির বিষয়টি মানতে নারাজ। ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতাও স্বাক্ষরিত হয়। যাহোক, একসময় বিষয়টির আপাত সমাধানও হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো একতরফাভাবে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন। বিনিময়ে ভারতও ঘোষণা দেয় যে এ মুহূর্তে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের রণাঙ্গনে আটক হওয়া পাকিস্তানি সৈন্যদের মুক্তি দেওয়া হবে। অনিলদের ভাগ্যের সুখপাখি সেদিনই ডানা মেলল। তাঁরা মুক্ত হলেন। তারিখ ১ ডিসেম্বর ১৯৭২।
কিন্তু বাংলাদেশে আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সৈন্যদের মুক্তি পেতে লেগে যায় আরও তিনটি বছর। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি ও প্রত্যাবর্তন বিষয়ে দিল্লিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল। সেই চুক্তির বলে ১৪ নভেম্বর তারা মুক্ত হয়। তাদের মধ্যে ছিল কয়েক শ বাঙালি রাজাকারও।

যে যুদ্ধের শেষ নেই
একাত্তরের যুদ্ধবন্দীদের কথা সবাই যখন ভুলতে বসেছে, তখন হঠাৎ সামনে চলে আসে নাসিরের কথা। তাঁর আদি নিবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিপুরে। একাত্তরের বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক হন পাকিস্তানি নাগরিক নাসির উদ্দীন। স্বাধীনতার পর তাঁকে হস্তান্তর করা হয় ভারতীয়দের হাতে। তারপর বহুবছর কেউ তাঁর খোঁজ করেনি। যেন নাসির নামে কেউ কখনো ছিল না। কিন্তু ২০০৮ সালে কলকাতার আলিপুর জেল থেকে ছাড়া পাওয়া এক কয়েদি পুরোনো ইতিহাস ধরে টান দেন। মুক্তি পেয়েই তিনি গাজিপুরে নাসিরের আত্মীয়দের কাছে খবর পাঠান: নাসির বেঁচে আছে, ২০০০ সালে তাঁকে শেষ দেখা গেছে আলিপুর জেলে। খবর যায় করাচিতে বসবাসরত নাসিরের ছেলে হোসাইনের কাছে।
হোসাইনরা মেনে নিয়েছিল যে তাদের বাবা মারা গেছেন। কিন্তু নতুন খবরে আবার শুরু হলো তাদের দহন। কীভাবে তারা ফিরে পাবে ৩৭ বছর আগের যুদ্ধবন্দী নাসিরকে? একই প্রশ্ন ভারতের সুমন পুরোহিতের, ‘আমার বিয়ের ১৮ মাস পরে, আমার ছেলে বিপুলের জন্নের তিন মাসের মাথায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে আমার স্বামী বিমান নিয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাতে গিয়ে নিখোঁজ হন।’ তখন সুমনের বয়স ছিল ২৩ বছর, এখন ৫৯। ৩৭ বছর ধরে তিনি খুঁজে চলেছেন তাঁর স্বামীর সন্ধান। নানান সময়ে খবর আসে, কেউ নাকি তাঁকে দেখেছে পাকিস্তানের কারাগারে। বিভিন্ন বইপত্রেও এ রকম ইঙ্গিত মেলে। এ রকম আরও ৫৪ জন নিখোঁজ ভারতীয় সৈনিকের পরিবারের সদস্যরা এখানে-ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছে−যদি স্বজনের খোঁজ মেলে, যদি তার দেখা মেলে!
এই খোঁজাখুঁজির দৌড়ে ছুটতে ছুটতে ওই ৫৪ জনের পরিবার মিলে একটি সংগঠনও বানিয়েছে। তাদের কাজ নিখোঁজ যুদ্ধবন্দীদের হদিস বের করা এবং তাদের মুক্ত করার জন্য তদবির করা। পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলেও তারা ঘুরে বেড়িয়েছে।
তিনটি জেলে খোঁজা শেষ করে বৃদ্ধ সুমন এখন তরুণী বয়সে হারানো তাঁর তরুণ স্বামীকে খঁুজতে যাবেন লাহোর জেলে। সেখানে না পেলে রাওয়ালপিন্ডি অথবা লায়ালপুরে অথবা অন্য কোথাও। ‘আমি খুঁজবই। খঁুজে না পেয়ে জেল গেট দিয়ে হেঁটে বের হয়ে আসা অসহ্য লাগে। মনে হয় আর পারব না, কিন্তু আশা আমাকে পাথরের মতো শক্ত করেছে।’
ওদিকে পাকিস্তানের করাচি থেকে নাসিরের ছেলে হোসাইনও কলকাতায় আসছে তার বাবাকে খঁুজে বের করতে। এ রকম কত হোসাইন আর কত সুমন বুকে পাথর বেঁধে ছুটে বেড়াচ্ছে কোনো বিস্মৃত যুদ্ধবন্দীকে মুক্ত করার জন্য। সেই ছোটাছুটির মধ্যে কোনো জেলে বা কোনো সীমান্তে একদিন হয়তো তাদের দেখাও হয়ে যাবে। সেই দেখাদেখির মধ্যে কোনো শত্রুতা থাকবে কি? যে যুদ্ধের বন্দী তাদের বাবা ও স্বামী, সেই যুদ্ধ তো অনেক আগেই শেষ। কিন্তু তাদের লড়াই বুঝিবা এখনো শেষ হয়নি। তাদের আত্মীয়রা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বন্দী হয়েছিল। কিন্তু আপনজনকে মুক্ত করার লড়াইয়ে আজ তারা এক। সেই লড়াইয়ে তারা আর ভারতীয় বা পাকিস্তানি নয়; তারা সহযোদ্ধা। তারা যুদ্ধবন্দীদের স্বজন। অন্যদিকে কোনো এক অজ্ঞাত কারাকক্ষে কোনো একজন পুরোহিত বা নাসির অপেক্ষা করেন−একদিন ডাক আসবে মুক্তির। দেয়ালের গায়ে দাগ কেটে কেটে তাঁরা হয়তো বছর পেরোনোর হিসাব রাখেন। কত বছর পেরোল? দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে তাঁরা গোনা শেষ করেন: ৩৭ বছর!

রশীদ তালুকদারের ছবির কথা

প্রকাশ: দৈনিক প্রথম আলো, বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যা, ১৬-‌১২‌-২০০৮

একাত্তরের রণাঙ্গনে একজন বিহারি মুক্তিযোদ্ধা: সুবেদার সৈয়দ খান বীর প্রতীক


প্রকাশ: দৈনিক প্রথম আলো, বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যা, ১৬-‌১২‌-২০০৮



একাত্তরে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমি ইপিআর বাহিনীতে কর্মরত ছিলাম। আমার কোম্পানি তখন কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ছিল। ২৬ মার্চ আমার কোম্পানির সদস্যরা ক্যাপ্টেন নওয়াজীর নেতৃত্বে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। সে সময় অবাঙালি হিসেবে সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিল। অর্থাৎ আমি এখন কী করব। কেউ কেউ আমাকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমার মধ্যে এ দেশের মায়া খুবই কাজ করতে থাকে। আমি আমার কোম্পানির অন্য সদস্যদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের কোম্পানি কাউনিয়া ব্রিজের অপর প্রান্তে অবস্থান নেয়। সে সময় কাউনিয়ায় জিআরপি থানা ছিল। সেখানে পাকিস্তানিরা ছিল। আমরা প্রথমে তাদেরই টার্গেট করি। ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে আমরা ব্রিজের অপর প্রান্তে অবস্থান নিয়েছিলাম, ওরা বুঝতে পারেনি। এ সময় এক পাকিস্তানি মেজর ও তিনজন সিপাহি এবং একজন বাঙালি ওসি ব্রিজ পার হয়ে আমাদের অবস্থানের দিকে আসছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাঙালি অফিসারটিই সামনে ছিলেন। সে সময় ব্রাশ ফায়ার করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তা করলে বাঙালি অফিসারটির বাঁচার কোনো উপায় নেই। এদিকে তাঁকে রক্ষার জন্য যদি আক্রমণ না করি, তাহলে তারা আমাদের অবস্থানের খবর পেয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, দেশের স্বার্থে হতভাগ্য বাঙালি অফিসারটির জীবন অবসানই মঙ্গলজনক। ব্রাশ ফায়ারের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকেই। পাক জোয়ানদের সঙ্গেই মারা পড়লেন বাঙালি অফিসারটিও। কাউনিয়া ব্রিজের অপারেশন দিয়েই শুরু হলো আমাদের যুদ্ধ।
এর পরই পাকবাহিনীর লোকেরা টের পেয়ে যায় যে তাদের খুব কাছেই আমরা অবস্থান নিয়ে আছি। তারা গুলি চালাতে শুরু করল। আমরাও এবার থেকে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে গেলাম। পাকসেনারা খুব চেষ্টা করে ব্রিজ পার হওয়ার জন্য, কিন্তু কিছুতেই আমরা সে সুযোগ দিয়নি। সেদিন এই ব্রিজ পার হওয়া পাকবাহিনীর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম সম্মুখযুদ্ধে আমরা তাদের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হই।
এদিকে পাকবাহিনী কিছুতেই ব্রিজ পার না হতে পেরে বিকল্প বুদ্ধি অাঁটে। তারা প্লেনে করে আমাদের তিন-চার কিলোমিটার পেছনে মহেন্দ্রনগরে আসে। আমরা গোপন সূত্রে সে খবর পেয়ে যাই যে পাকসেনারা পেছন দিক থেকে আমাদের আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। সে সময় আমরা দ্রুত সেখান থেকে রাজাহাট হয়ে কুড়িগ্রাম চলে আসি। এ সময় আমাদের কোম্পানিতে ইপিআর ও কিছু মুক্তিসেনা মিলে প্রায় ৬০ জন সদস্য ছিল।
কুড়িগ্রামে তিন জায়গায় আমরা ডিফেন্স নিই। তিন জায়গাতেই লড়াই হয়। পাকসেনারা তাদের অবস্থান ছেড়ে চলে যায়। পরের দিন আবার এসে আক্রমণ চালায়। সেখানে এভাবে আমরা তাদের মোকাবিলা করতে পারছিলাম না। আমাদের কাছে ভারী কোনো অস্ত্র ছিল না। বাধ্য হয়ে আমরা নদী পার হয়ে পাটেশ্বরী চলে এলাম। এর পর ভূরুঙ্গামারী হাইস্কুল ক্যাম্পে এসে উঠি। সেখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা। সেখান আমাদের সঙ্গে একপর্যায়ে এক কোম্পানি ভারতীয় সেনা এসে যোগ দেয়। আমরা খবর পাই হাতিবান্ধা থানায় পাঞ্জাবিরা ডিফেন্স নিয়ে আছে। আমি ৪০ জন সেনাসদস্য নিয়ে ফায়ার করতে করতে এগোতে থাকি। একই সঙ্গে ভারতীয় সেনারা ওপর থেকে সিলিং করতে থাকে। আমরা যখন শত্রুদের কাছাকাছি চলে যাই, ভারতীয় সেনারা সিলিং বন্ধ করে এবং আমরা ফায়ার শুরু করি। এ সময় পাঞ্জাবিরা সিলিং শুরু করে দিল। এতে আমাদের বরিশালের একজন নায়েক সুবেদার সেখানে শহীদ হন। একপর্যায়ে পাঞ্জাবিরা পাশের একটা নালা ধরে পেছনে সরে যায়। ওই অপারেশনে কোনো পাঞ্জাবি মারা গেছে কি না, আমরা জানতে পারিনি। কিন্তু পরে আমরা সেখানে গিয়ে অনেক রক্ত দেখতে পেয়েছি। আমাদের ধারণা, সেখানে অনেক হতাহত হয়েছে। তারা তাদের (আহত-নিহত) সরিয়ে নিয়ে যায়।
আমরা রংপুরের হারাগাছা এলাকায় থাকতেই দেশ স্বাধীন হয়। দুটি অপারেশনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য আমাকে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়।
বি. দ্র. সৈয়দ খানের বয়স এখন প্রায় ৮২। এখন তিনি অনেক কিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারেন না। গুছিয়ে বলতেও পারেন না। তাছাড়া যুদ্ধের পর তাঁর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের হত্যা করেছিল। তিনি যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে পরিবারের আর কাউকে পাননি। এ অবস্থায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হলেও আর্থিক অনটনের কারণে সেই স্ত্রীও তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে চলে গেছেন। এখন তিনি পরিণত বয়সে একেবারে অসহায় অবস্থায় অন্যের আশ্রয়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় তাঁর স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তা পত্রস্থ করা হলো।
অনুলিখন: আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী অফিস